Humane Foundation
জলবায়ু

প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ন্যায়বিচার: আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব ২০২৪

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ন্যায়বিচার মানে এই অঞ্চলের মানুষের অধিকার ও তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপন রক্ষা করা, যেখানে তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সবচেয়ে বেশি শিকারী।

লিখেছেন ড. অনিন্দিতা চন্দ4 মিনিট পঠনকলকাতা, ভারত
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলমগ্ন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের গ্রাম, যা জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
Humane Foundation

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ন্যায়বিচার মূলত দুর্বল জনগোষ্ঠীগুলোর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যারা ঐতিহাসিক ভাবে স্বল্প কার্বন নিঃসরণে অবদান রেখেও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতির শিকার হচ্ছে, তাই আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব হল তাদের পাশে দাঁড়ানো। এই অঞ্চলের মানুষরা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়ের মতো সংকটগুলির সম্মুখীন, যা তাদের জীবন-জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে (IPCC, 2023)।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ কেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির শিকার?

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, যেমন তুভালু, কিরিবাতি এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ এবং মারাত্মক শিকার। এই ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলির নিচু ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের সামান্য বৃদ্ধিতেও সম্পূর্ণ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে (UNEP, 2021)। এর ফলে পানীয় জলের উৎস লবণাক্ত হয়ে যায়, কৃষিজমি নষ্ট হয় এবং বহু বসতি স্থানচ্যুত হতে বাধ্য হয়।

এই দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার বিশ্বে সর্বনিম্ন হলেও, শিল্পোন্নত দেশগুলোর দূষণের ফল ভোগ করতে হচ্ছে তাদের। উদাহরণস্বরূপ, তুভালু বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্র ০.০০৩% এর জন্য দায়ী, কিন্তু তারা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুতর পরিণতিগুলির সম্মুখীন (World Bank, 2022)। এই বৈষম্যই প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি।

দেশকার্বন নিঃসৃত পরিমাণ (টন/ব্যক্তি)সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা (%)
তুভালু১.৮৮০%
কিরিবাতি০.৯৬৭%
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ১.৯৪০%
ফিজি২.৪২০%
পাপুয়া নিউ গিনি০.৫১০%
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলির বার্ষিক কার্বন নিঃসরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার তুলনা। Source: World Bank, 2022

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিতে কী প্রভাব পড়ছে?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে জীবন-জীবিকার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মাছ ধরা এবং কৃষিকাজ, যা এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা, গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোরাল ব্লিচিং মাছের প্রজনন ক্ষেত্রকে নষ্ট করছে, এবং লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতিকে অকার্যকর করে তুলছে (Secretariat of the Pacific Regional Environment Programme, 2023)।

এসবের ফলে খাদ্য নিরাপত্তার চরম সংকট দেখা দিচ্ছে। উপরন্তু, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মাতৃভূমি হারানোর ভয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বহু দ্বীপের মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের কবরস্থান এবং পবিত্র স্থানগুলি সাগরে বিলীন হয়ে যেতে দেখে গভীরভাবে মর্মাহত হচ্ছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, আত্মপরিচয়ের সংকটও তৈরি করছে (University of the South Pacific, 2021)।

“যখন সমুদ্র আপনার গ্রামকে গিলে ফেলে, আপনি কেবল আপনার বাড়ি হারান না, আপনি আপনার ইতিহাস, আপনার সংস্কৃতি এবং আপনার পরিচিতি হারান। এটি কেবল জমি নয়, এটি আত্মার বিষয়।”

আইরিন সাকে (জলবায়ু কর্মী, ফিজি ফোরাম)

জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন?

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। শিল্পোন্নত দেশগুলোর উচিত তাদের কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন অপরিসীম (Loss and Damage Fund, COP28)। এই অঞ্চলের দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে তহবিল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা সরবরাহ করা দরকার।

জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলির জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করতে এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষত, জলবায়ু উদ্বাস্তু বিষয়ক একটি সুস্পষ্ট নীতি অপরিহার্য (UNHCR, 2023)।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি (১৯০০-২০২১)

Source: NOAA, 2023

সবচেয়ে শক্তিশালী পাল্টা যুক্তি কি এবং কিভাবে মোকাবিলা করা উচিত?

একটি শক্তিশালী পাল্টা যুক্তি হলো যে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং কোনো একক দেশ বা অঞ্চল এর জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী নয়, তাই কোনো বিশেষ অঞ্চলের জন্য আলাদা করে 'ক্ষতিপূরণ' বা 'ন্যায়বিচার' এর ধারণাটি জটিল এবং বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে। কিছু দেশ যুক্তি দেয় যে তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা সীমিত (US Congressional Research Service, 2022)।

এই যুক্তির মোকাবিলায় বলা যেতে পারে যে যদিও জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, এর প্রভাব অসম। ঐতিহাসিক ভাবে উন্নত দেশগুলো শিল্পায়নের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণে বেশি অবদান রেখেছে, যার ফলে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এই ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং অসম প্রভাবের শিকার হওয়া দেশগুলোর প্রতি উন্নত দেশগুলোর নৈতিক কর্তব্য রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল মানবিকতাই নয়, এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য (Oxford Environmental Change Institute, 2023)।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

জলবায়ু ন্যায়বিচার কী এবং কেন এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ?+

জলবায়ু ন্যায়বিচার হলো এই ধারণা যে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় নৈতিক ও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ তারা এর জন্য ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে কম দায়ী।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জকে প্রভাবিত করছে?+

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নিচু দ্বীপগুলো প্লাবিত হচ্ছে, পানীয় জলের উৎস লবণাক্ত হয়ে পড়ছে, কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে এবং উপকূলীয় ক্ষয় হচ্ছে। এতে মানুষের জীবন-জীবিকা, বাসস্থান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত জলবায়ু বাস্তুচ্যুতির কারণ হচ্ছে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?+

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো ম্যাংগ্রোভ রোপণ, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, আদিবাসী জ্ঞান ব্যবহার করে অভিযোজন কৌশল অবলম্বন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু ন্যায়বিচারের জন্য জোরালোভাবে আওয়াজ তুলছে। তারা আরও বেশি আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য উন্নত দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিভাবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলবায়ু ন্যায়বিচারে অবদান রাখতে পারে?+

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষতির জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান, প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া, এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো তৈরি করার মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলবায়ু ন্যায়বিচারে অবদান রাখতে পারে।

আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের জন্য পদক্ষেপ

প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রেক্ষাপটে জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানবিক অধিকার, ঐতিহাসিক দায় এবং বৈশ্বিক নৈতিকতার প্রশ্ন। আমাদের, উন্নত বিশ্বের নাগরিক হিসেবে এবং এই গ্রহের অংশীদার হিসেবে, এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের আরও সক্রিয় হতে হবে এবং নীতিগত পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

আমরা যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিই, তাহলে আমরা কেবল একটি অঞ্চলকে হারাতে যাচ্ছি না, আমরা মানবজাতির এক বিরাট অংশের জীবন ও ঐতিহ্যকে বিলীন হতে দেখব। জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য অপরিহার্য। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বসবাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Enjoyed this? Save or share.

জলবায়ু
খাদ্য বর্জ্য ও জলবায়ু নিঃসরণ এর ভয়াবহতা
জলবায়ু

খাদ্য বর্জ্য ও জলবায়ু নিঃসরণ: বইয়ের সহায়ক ব্যাখ্যা ২০২৪

খাদ্য বর্জ্য বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনে অন্যতম প্রধান কারণ, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এর প্রভাব কমাতে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।

4 মিনিট পঠন

একটি চারণভূমিতে গবাদি পশুর পাল, যাদের থেকে নিঃসৃত মিথেন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ।
জলবায়ু

গবাদি পশু থেকে মিথেন নিঃসরণ জলবায়ুর জন্য এত বিপজ্জনক কেন?

গবাদি পশুর হজম প্রক্রিয়া থেকে নির্গত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস মিথেন কীভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে এবং এর কার্যকরী সমাধানগুলি কী হতে পারে, তার একটি গভীর বিশ্লেষণ।

4 মিনিট পঠন

একজন স্বেচ্ছাসেবক একটি প্রাণী অধিকার সংস্থার অভয়ারণ্যে একটি উদ্ধার করা পশুকে আদর করছেন, যা কার্যকরী প্রাণী অধিকার সংস্থাগুলোকে সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরে।
প্রাণী অধিকার

প্রাণী অধিকার সংস্থা নিয়ে ৫টি প্রচলিত ধারণা: কোনটি সত্যি, কোনটি নয়

কার্যকরী প্রাণী অধিকার সংস্থা খুঁজে বের করা কঠিন হতে পারে, কিন্তু স্বচ্ছতা, প্রভাব এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে আপনার সমর্থন সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে।

4 মিনিট পঠন

বিশেষ লেখা