গবাদি পশু থেকে মিথেন নিঃসরণ মূলত তাদের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়ার একটি উপজাত। এই প্রক্রিয়া, যা এন্টারিক ফার্মেন্টেশন নামে পরিচিত, তার মাধ্যমে মিথেন (CH4) নামক একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন হয় এবং এটি গরুর ঢেকুরের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে মেশে। কৃষিক্ষেত্র থেকে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের একটি বড় অংশ এর জন্য দায়ী এবং এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।
গবাদি পশু থেকে মিথেন আসলে কী এবং কীভাবে তৈরি হয়?
যখন আমরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলি, তখন প্রায়শই কার্বন ডাই অক্সাইড এবং জীবাশ্ম জ্বালানির কথা উঠে আসে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস হলো মিথেন (CH4), এবং এর একটি প্রধান উৎস হলো আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ—গবাদি পশু। এই মিথেন নির্গমন প্রক্রিয়াটি গরুর শারীরিক কার্যকলাপের সঙ্গেই জড়িত।
গরু এবং অন্যান্য রোমন্থক প্রাণীদের চারটি প্রকোষ্ঠযুক্ত পাকস্থলী থাকে, যা তাদের সেলুলোজ-সমৃদ্ধ উদ্ভিদ পদার্থ হজম করতে সাহায্য করে, যা মানুষ পারে না। এই প্রক্রিয়ার সময়, তাদের রুমেনে থাকা লক্ষ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া, আর্কিয়া এবং প্রোটোজোয়া খাবারের গাঁজন ঘটায়। এই গাঁজন প্রক্রিয়ারই একটি স্বাভাবিক উপজাত হলো মিথেন। একটি প্রাপ্তবয়স্ক গরু প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ লিটার পর্যন্ত মিথেন নির্গত করতে পারে (PNAS, 2021)। প্রচলিত ধারণা সত্ত্বেও, এই মিথেনের প্রায় ৯৫% গরুর ঢেকুরের মাধ্যমে নির্গত হয়, মলদ্বার দিয়ে নয়।
কেবল হজম প্রক্রিয়া নয়, গবাদি পশুর মল বা গোবর থেকেও মিথেন নির্গত হয়। যখন বিপুল পরিমাণ গোবর একসাথে জমা করে রাখা হয়, বিশেষ করে শিল্পভিত্তিক বড় খামারগুলিতে, তখন বায়ুরোধী পরিবেশে (অ্যানেরোবিক) পচন শুরু হয় এবং মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস তৈরি হয়।
জলবায়ুর উপর এর প্রভাব কতটা গুরুতর?
মিথেনকে একটি ‘সুপার-ওয়ার্মার’ বা অতি-উষ্ণতাকারী গ্যাস বলা হয়। যদিও এটি কার্বন ডাই অক্সাইডের (CO2) মতো দীর্ঘ সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে থাকে না (মিথেন প্রায় ১২ বছর থাকে, যেখানে CO2 শত শত বছর থাকতে পারে), তবে এর তাপ আটকে রাখার ক্ষমতা অনেক বেশি। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)-এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন (২০২১) অনুসারে, বায়ুমণ্ডলে নির্গত হওয়ার পর প্রথম ২০ বছরের হিসাবে মিথেন CO2-এর চেয়ে ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এর অর্থ হলো, স্বল্পমেয়াদে পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধিতে মিথেনের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী পশুপালন খাত মানুষের দ্বারা সৃষ্ট মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ১৪.৫%-এর জন্য দায়ী। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবহনের মতো সমস্ত দিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে কেবল গবাদি পশুই (গরু) পশুপালন খাতের মোট নিঃসরণের প্রায় ৬৫% তৈরি করে।

বিশ্বব্যাপী পশুপালন খাতের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের উৎস
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, গরুর হজম প্রক্রিয়া এবং তাদের জন্য খাদ্য উৎপাদন—উভয়ই জলবায়ু পরিবর্তনে വലിയ প্রভাব ফেলছে। যেহেতু মিথেন বায়ুমণ্ডলে তুলনামূলকভাবে কম সময় থাকে, তাই এর নিঃসরণ কমাতে পারলে খুব দ্রুতই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি কমানো সম্ভব। অনেক বিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারক তাই মিথেনকে জলবায়ু সংকট মোকাবেলার একটি ‘সহজলভ্য সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন।
“মিথেন নিঃসরণ কমানো হলো জলবায়ু উষ্ণায়নের গতিকে এই দশকেই মন্থর করার জন্য আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়। গবাদি পশুর মিথেন কমানোর প্রযুক্তি এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা দ্রুত ফলাফল পেতে পারি।”
বিশ্বের কোন অঞ্চলগুলি থেকে এই নিঃসরণ সবচেয়ে বেশি হয়?
গবাদি পশু থেকে মিথেন নিঃসরণের মাত্রা বিশ্বজুড়ে সমান নয়। যে সব দেশে গবাদি পশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, স্বাভাবিকভাবেই সেই সব দেশ থেকে নিঃসরণও বেশি হয়। মাংস এবং দুগ্ধজাত পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে পশুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। FAOSTAT (২০২২)-এর তথ্য অনুযায়ী, গবাদি পশু পালনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলি হলো ব্রাজিল, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন।
ল্যাটিন আমেরিকা, বিশেষ করে ব্রাজিল, গরুর মাংসের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হওয়ায় এখানকার মিথেন নিঃসরণের হার অনেক বেশি। অন্যদিকে, ভারতে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গবাদি পশুর পাল রয়েছে, যা মূলত দুধ এবং কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। যদিও মাথাপিছু মাংস খাওয়ার হার কম, পশুর বিশাল সংখ্যার কারণে মোট নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে শিল্পভিত্তিক খামারের কারণে মাথাপিছু গরুর নিঃসরণের হার বেশি, কারণ সেখানে উচ্চ-উৎপাদনশীল জাতের পশুদের জন্য উচ্চ-শক্তিযুক্ত খাবার ব্যবহার করা হয়।
| দেশ/অঞ্চল | গবাদি পশুর সংখ্যা (মিলিয়ন) | আনুমানিক মিথেন নিঃসরণ (মিলিয়ন টন) |
|---|---|---|
| ব্রাজিল | 224.6 | 11.8 |
| ভারত | 305.5 | 11.2 |
| চীন | 98.3 | 6.9 |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | 92.7 | 5.5 |
| ইউরোপীয় ইউনিয়ন | 76.5 | 4.2 |
| আর্জেন্টিনা | 53.4 | 3.3 |
গবাদি পশুর মিথেন নির্গমন কি কমানো সম্ভব?
হ্যাঁ, গবাদি পশু থেকে মিথেন নিঃসরণ কমানোর জন্য একাধিক উপায় নিয়ে গবেষণা ও কাজ চলছে। এই সমাধানগুলিকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, খামার ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন।
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো গরুর খাদ্য পরিবর্তন। অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CSIRO) দ্বারা পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, গরুর খাদ্যে সামান্য পরিমাণে ‘অ্যাসপারাগোপসিস ট্যাক্সিফর্মিস’ (Asparagopsis taxiformis) নামক এক প্রকার সামুদ্রিক শৈবাল মেশালে মিথেন নিঃসরণ ৮০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এছাড়াও, 3-নাইট্রোক্সিপ্রোপানল (3-NOP) নামক একটি রাসায়নিক যৌগও মিথেন উৎপাদনকারী অণুজীবকে বাধা দিয়ে নিঃসরণ প্রায় ৩০% কমাতে পারে (Journal of Dairy Science, 2020)। এই প্রযুক্তিগুলির বাণিজ্যিক প্রয়োগ এখনও সীমিত, তবে ভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

খামার ব্যবস্থাপনার উন্নতির মধ্যে রয়েছে আরও ভালো মানের পশুখাদ্য সরবরাহ করা যা সহজে হজম হয় এবং কম মিথেন তৈরি করে। পাশাপাশি, গোবর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। অ্যানেরোবিক ডাইজেস্টার ব্যবহার করে গোবর থেকে মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করে তা বায়োগ্যাস হিসেবে বিদ্যুৎ বা তাপ উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি কেবল গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণই কমায় না, বরং খামারের জন্য একটি বিকল্প শক্তির উৎসও তৈরি করে।
তবে সবচেয়ে প্রভাবশালী দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হতে পারে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। বিশ্বজুড়ে গরুর মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা কমানো গেলে গবাদি পশুর সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যুগান্তকারী গবেষণা (Poore & Nemecek, 2018, Science) দেখায় যে খাদ্যতালিকা থেকে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য বাদ দিলে একজন ব্যক্তির খাদ্য-সম্পর্কিত কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৭৩% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এটি জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় যেকোনো ব্যক্তির জন্য অন্যতম শক্তিশালী একটি পদক্ষেপ।
ভোক্তারা কীভাবে এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন?
যদিও নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অপরিহার্য, ভোক্তাদের পছন্দও এই ক্ষেত্রে একটি বড় চালিকাশক্তি। ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
জলবায়ু-বান্ধব খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার কয়েকটি ধাপ
- 1
রেড মিট কমানো
আপনার খাদ্যতালিকা থেকে গরুর মাংসের (বিফ) পরিমাণ কমানো শুরু করুন। এটি মিথেন নিঃসরণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। সপ্তাহে একদিন বা দুইদিন মাংস না খেয়ে শুরু করতে পারেন।
- 2
উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিন গ্রহণ
ডাল, ছোলা, বিনস, সয়াবিন, টফু এবং অন্যান্য উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিনের ব্যবহার বাড়ান। এগুলি পুষ্টিকর এবং এদের পরিবেশগত প্রভাব অনেক কম।
- 3
দুগ্ধজাত পণ্যের বিকল্প
সয়া, আমন্ড, বা ওট মিল্কের মতো উদ্ভিদ-ভিত্তিক দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের বিকল্পগুলি চেষ্টা করে দেখুন। এগুলির উৎপাদন প্রক্রিয়াতেও কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়।
- 4
স্থানীয় ও موسمي খাবার
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও موسمي ফল ও সবজি কিনুন। এটি খাবারের পরিবহনজনিত কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে সাহায্য করে।
- 5
খাদ্য অপচয় রোধ
খাবার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। উৎপাদিত কিন্তু খাওয়া হয় না এমন খাবার পচে গিয়েও মিথেন তৈরি করে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করুন এবং অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করুন।
এই পরিবর্তনগুলি রাতারাতি করতে হবে এমন নয়। ধীরে ধীরে নিজের খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন আনলেই তা পরিবেশের জন্য একটি বড় অবদান রাখতে পারে। আপনার প্রতিটি পছন্দই একটি বার্তা পাঠায় যে আমরা একটি আরও টেকসই এবং জলবায়ু-বান্ধব খাদ্য ব্যবস্থার দিকে এগোতে চাই।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
শুধু গরুই কি মিথেন তৈরি করে?+
না, যদিও গরু সবচেয়ে বড় উৎস, তবে ভেড়া, ছাগল ও মহিষের মতো অন্যান্য রোমন্থক প্রাণীও তাদের হজম প্রক্রিয়ায় মিথেন তৈরি করে। এছাড়াও, প্রাকৃতিক জলাভূমি, ধানক্ষেত এবং জীবাশ্ম জ্বালানি নিষ্কাশন ও ব্যবহারও বায়ুমণ্ডলীয় মিথেনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
গরুর ঢেকুরের মিথেন কি প্রাকৃতিক চক্রের অংশ নয়?+
হ্যাঁ, এটি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু সমস্যাটি এর মাত্রায়। শিল্পভিত্তিক পশুপালনের জন্য বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি গবাদি পশু পালন করা হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক কার্বন চক্রের ভারসাম্যকে নষ্ট করছে এবং বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত মিথেন যোগ করছে যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
মিথেন কমানোর জন্য সামুদ্রিক শৈবাল খাওয়ানো কতটা বাস্তবসম্মত?+
গবেষণায় এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও, এটিকে বিশ্বব্যাপী প্রয়োগ করা এখনও চ্যালেঞ্জিং। নির্দিষ্ট প্রজাতির শৈবাল (Asparagopsis) প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করা, সংগ্রহ করা এবং সারা বিশ্বের খামারগুলিতে সরবরাহ করার জন্য একটি শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন প্রয়োজন, যা এখনও তৈরি হয়নি।
উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস কি সত্যিই জলবায়ুর জন্য ভালো?+
হ্যাঁ, এটি জলবায়ুর উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলার অন্যতম শক্তিশালী উপায়। উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবার উৎপাদনে সাধারণত অনেক কম জমি, জল এবং শক্তি প্রয়োজন হয় এবং এটি অনেক কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত করে। একাধিক গবেষণা এটি প্রমাণ করেছে।





