গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকা যখন প্রকাশিত হয়, তখন সাধারণত শক্তি খাত ও পরিবহনকে দায়ী করা হয়। কিন্তু আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, এই দেশগুলোর খাদ্য ব্যবস্থা—বিশেষ করে প্রাণীজ পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল—বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৩১ শতাংশের জন্য দায়ী (FAO, 2023)। এই নির্গমনের প্রভাব সরাসরি প্রাণীদের ওপর পড়ে, যারা খাদ্য শৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল অংশ।
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশ: আমরা কী পেয়েছি?
আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রাজিল, ভারত ও নেদারল্যান্ডস সবচেয়ে বেশি প্রাণীজ পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করে। এই দেশগুলোর খাদ্য ব্যবস্থা থেকে মোট নির্গমনের ৫৭ শতাংশ আসে গবাদি পশু পালন, সার ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ থেকে (Our World in Data, 2024)। ব্রাজিলে, আমাজন রেইনফরেস্টের ৮০ শতাংশ বন উজাড় হয় গবাদি পশুর চারণভূমি তৈরির জন্য, যা কার্বন স্টোরেজ ধ্বংস করে (INPE, 2023)।
“প্রাণী কৃষি থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, এটি সমগ্র পরিবহন খাতের চেয়ে বেশি। কিন্তু কোপ আলোচনায় এই বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।”
কীভাবে আমরা এই তথ্য পেয়েছি?
আমরা FAO, IPCC ও Our World in Data-র প্রকাশিত রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেছি। পাশাপাশি, ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (INPE) ও নেদারল্যান্ডসের পরিসংখ্যান ব্যুরোর নথি পর্যালোচনা করেছি। সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ—খামার থেকে জবাই, প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহন—চিহ্নিত করে নির্গমনের হিসাব করেছি। এছাড়া, কোপ২৯-এর খসড়া নথি ও লবি গ্রুপের বিবৃতি সংগ্রহ করেছি।
| দেশ | মোট নির্গমনে প্রাণী কৃষির অংশ (%) | প্রধান প্রাণীজ পণ্য |
|---|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | ১২.৫ | গরুর মাংস, দুগ্ধ |
| চীন | ১৮.২ | শূকর, মুরগি |
| ব্রাজিল | ২৪.১ | গরুর মাংস, সয়া (পশুখাদ্য) |
| ভারত | ১৫.৮ | দুগ্ধ, মহিষ |
| নেদারল্যান্ডস | ২২.৩ | দুগ্ধ, শূকর |
প্রাণীদের ওপর প্রভাব: কী বলছে নথি?
আমরা যে নথি ও রেকর্ড সংগ্রহ করেছি, তা দেখায় যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশগুলোর খাদ্য ব্যবস্থায় প্রাণীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। ব্রাজিলের একটি জবাইখানার পরিবেশগত অনুমতি নথি থেকে দেখা গেছে, সেখানে বছরে ৫০ হাজার গবাদি পশু জবাই করা হয়, যা থেকে প্রচুর মিথেন নির্গত হয় (IBAMA, 2023)। নেদারল্যান্ডসের একটি দুগ্ধ খামারের নথি অনুযায়ী, সেখানে প্রতিটি গাভী থেকে প্রতিদিন ৫০০ লিটার মিথেন নির্গত হয় (RIVM, 2022)। এই নির্গমন প্রাণীদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে, যেমন শ্বাসকষ্ট ও তাপ চাপ।
প্রাণী কৃষি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন (মিলিয়ন টন CO₂ সমতুল্য)
শিল্প প্রতিক্রিয়া: কী বলছে কর্পোরেট ও নীতিনির্ধারকরা?
আমরা যখন শিল্প প্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকদের সাথে যোগাযোগ করি, তখন তারা দাবি করেন যে প্রাণী কৃষি থেকে নির্গমন নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছেন। ব্রাজিলের মাংস রপ্তানিকারক সংস্থা (ABIEC) জানায়, তারা ২০৪০ সালের মধ্যে নির্গমন ৩০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এই পরিকল্পনাগুলো পর্যাপ্ত নয়। কোপ২৯-এ, খাদ্য ব্যবস্থার নির্গমন নিয়ে আলোচনা সীমিত ছিল, এবং প্রাণী কল্যাণের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয় (Climate Action Network, 2024)।
কী পরিবর্তন দরকার?
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো প্রাণীজ পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার কমানো। গবেষণা দেখায়, উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্যে রূপান্তর করলে খাদ্য ব্যবস্থার নির্গমন ৬১ শতাংশ কমতে পারে (University of Oxford, 2018)। এছাড়া, কোপ সম্মেলনগুলোতে প্রাণী কল্যাণ ও জলবায়ু ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে খামারের সংখ্যা কমাতে আইন প্রণয়ন করছে, কিন্তু এটি ধীর গতিতে এগোচ্ছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশ কোনগুলো?+
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডস। এই দেশগুলো মোট বৈশ্বিক নির্গমনের ৪৫ শতাংশের জন্য দায়ী, যার একটি বড় অংশ আসে প্রাণী কৃষি থেকে (Our World in Data, 2024)।
প্রাণী কৃষি কীভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়ায়?+
প্রাণী কৃষি থেকে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়। গবাদি পশুর হজম প্রক্রিয়া ও সার থেকে মিথেন আসে, আর সার মাটিতে প্রয়োগ থেকে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়। এই গ্যাসগুলো কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী (IPCC, 2021)।
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর উপায় কী?+
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্যে রূপান্তর। এছাড়া, খাদ্য অপচয় কমানো, টেকসই কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ ও বন উজাড় বন্ধ করা প্রয়োজন। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো খামারের সংখ্যা কমিয়ে নির্গমন কমানোর চেষ্টা করছে।
কোপ সম্মেলনগুলো প্রাণী কল্যাণ নিয়ে কেন আলোচনা করে না?+
কোপ সম্মেলনগুলোতে প্রাণী কল্যাণকে উপেক্ষা করা হয় কারণ শক্তিশালী মাংস ও দুগ্ধ লবি গ্রুপগুলো নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। খাদ্য ব্যবস্থার নির্গমন নিয়ে আলোচনা সীমিত, এবং প্রাণীদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় (Climate Action Network, 2024)।
বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে প্রাণী কৃষির ভূমিকা কী?+
বাংলাদেশে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের একটি ছোট অংশ প্রাণী কৃষি থেকে আসে, তবে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়ভাবে দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদন বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে নির্গমন বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্যের দিকে ঝোঁকার পরামর্শ দিচ্ছেন।










