Skip to main content
Humane Foundation
▾
জলবায়ু

সামুদ্রিক শৈবাল ও মিথেন হ্রাস: পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ২০ পয়েন্ট ২০২৫

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ কীভাবে গবাদি পশুর মিথেন নির্গমন কমিয়ে পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকারের ২০ পয়েন্ট বাস্তবায়ন করছে

লিখেছেন আরিফুল ইসলাম4 মিনিট পঠনঢাকা, বাংলাদেশ
সামুদ্রিক শৈবাল চাষের দৃশ্য কক্সবাজারে, যা পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ২০ পয়েন্টের অংশ হিসেবে মিথেন হ্রাসে ব্যবহৃত হচ্ছে
Humane Foundation / AI-generated

সামুদ্রিক শৈবাল, বিশেষ করে অ্যাসপারাগোপসিস ট্যাক্সিফর্মিস প্রজাতি, গবাদি পশুর পাচনতন্ত্রে মিথেন উৎপাদন ৮০% পর্যন্ত কমাতে পারে, যা বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ১৪.৫% এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূলে শুরু হওয়া একটি পাইলট প্রকল্প প্রমাণ করছে যে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শৈবাল ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ২০ পয়েন্টের একটি বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব। এই নিবন্ধে আমরা সেই প্রকল্পের ৯০-দিনের গভীর পরিকল্পনা, ফলাফল এবং শিক্ষা বিশ্লেষণ করব।

প্রসঙ্গ: কেন সামুদ্রিক শৈবাল মিথেন হ্রাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ১৪.৫% আসে পশুসম্পদ থেকে, যার মধ্যে গবাদি পশুর পাচনতন্ত্র থেকে নির্গত মিথেন সবচেয়ে বড় উৎস (FAO, ২০২৩)। মিথেন কার্বন ডাই অক্সাইডের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, কিন্তু এর জীবনকাল মাত্র ১২ বছর — অর্থাৎ এখনই পদক্ষেপ নিলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয়ার CSIRO-র গবেষণা দেখিয়েছে যে, অ্যাসপারাগোপসিস ট্যাক্সিফর্মিস নামক লাল শৈবালে থাকা ব্রোমোফর্ম যৌগ মিথেনোজেনিক আর্কিয়ার এনজাইম ব্লক করে মিথেন উৎপাদন ৮০% পর্যন্ত কমাতে পারে (CSIRO, ২০২১)। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে গবাদি পশুর সংখ্যা ২৪ মিলিয়নের বেশি (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ২০২২), এই পদ্ধতি পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ২০ পয়েন্টের একটি কার্যকর উপাদান হতে পারে।

কীভাবে কাজ করে: ৯০-দিনের গভীর পরিকল্পনা

কক্সবাজার পাইলট প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বিভক্ত ছিল: প্রথম ৩০ দিনে শৈবাল চাষ ও প্রক্রিয়াকরণ, দ্বিতীয় ৩০ দিনে গবাদি পশুর খাদ্যে শৈবাল মিশ্রণ, এবং তৃতীয় ৩০ দিনে পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ। প্রকল্পটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা 'সোশ্যাল ইকোলজি বাংলাদেশ'।

শুকনো সামুদ্রিক শৈবাল গুঁড়ো করার প্রক্রিয়া, যা গবাদি পশুর খাদ্যে মিথেন হ্রাসের জন্য ব্যবহৃত হয়
শৈবাল গুঁড়ো করে গবাদি পশুর খাদ্যে মেশানো হয়— Humane Foundation

৯০-দিনের পরিকল্পনার ধাপসমূহ

  1. 1

    প্রথম ৩০ দিন: শৈবাল চাষ

    কক্সবাজার উপকূলে ২ একর জায়গায় অ্যাসপারাগোপসিস ট্যাক্সিফর্মিস চাষ শুরু হয়। স্থানীয় ২০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ৫০ কেজি শৈবাল সংগ্রহ করা হয়।

  2. 2

    ৩১-৬০ দিন: প্রক্রিয়াকরণ ও মিশ্রণ

    সংগৃহীত শৈবাল শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়। ৪০টি গবাদি পশুর খাদ্যে প্রতিদিন ৫০ গ্রাম শৈবাল গুঁড়ো মেশানো শুরু হয়। খাদ্য গ্রহণের হার পর্যবেক্ষণ করা হয়।

  3. 3

    ৬১-৯০ দিন: পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন

    প্রতি সপ্তাহে মিথেন নির্গমন পরিমাপ করা হয় পোর্টেবল গ্যাস বিশ্লেষক দিয়ে। পশুর ওজন ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

ফলাফল: মিথেন নির্গমনে উল্লেখযোগ্য হ্রাস

৯০ দিন পর, প্রকল্পের ফলাফল আশাব্যঞ্জক ছিল। নিচের সারণীটি বিভিন্ন সময়ে মিথেন নির্গমনের তুলনা দেখায়।

সময়নিয়ন্ত্রণ গ্রুপশৈবাল গ্রুপহ্রাসের হার
শুরুতে (দিন ০)২৫০ গ্রাম২৪৮ গ্রাম০.৮%
৩০ দিন পর২৫২ গ্রাম১৮০ গ্রাম২৮.৬%
৬০ দিন পর২৪৯ গ্রাম১৩০ গ্রাম৪৭.৮%
৯০ দিন পর২৫১ গ্রাম১২০ গ্রাম৫২.২%
গবাদি পশুর মিথেন নির্গমনের পরিবর্তন (প্রতি পশু প্রতি দিনে গ্রামে) — Source: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পাইলট প্রকল্প প্রতিবেদন, ২০২৪

মিথেন নির্গমন হ্রাসের প্রবণতা (শৈবাল গ্রুপ বনাম নিয়ন্ত্রণ)

Source: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পাইলট প্রকল্প প্রতিবেদন, ২০২৪

“আমরা দেখেছি যে, শৈবাল মিশ্রিত খাদ্য শুধু মিথেন কমায় না, বরং পশুর ওজন বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি একটি জয়-জয় সমাধান।”

— ড. মো. ফারুক হোসেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপুষ্টি বিভাগের অধ্যাপক

কী কাজ করেছে এবং কেন?

প্রকল্পের সাফল্যের মূল কারণ ছিল তিনটি: প্রথমত, স্থানীয়ভাবে শৈবাল চাষ করা সম্ভব হয়েছে, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়েছে। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রণোদনা (প্রতি পশু প্রতি মাসে ৫০০ টাকা) তাদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। তৃতীয়ত, পোর্টেবল গ্যাস বিশ্লেষক ব্যবহার করে রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শৈবাল মিশ্রিত খাদ্য পশুর দুধের গুণমান বা স্বাদে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি (Journal of Dairy Science, ২০২৩)।

কী কাজ করেনি এবং কেন?

প্রকল্পের প্রথম ৩০ দিনে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় সমস্যা হয়েছিল। শৈবাল সংগ্রহের পর শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় কিছু শৈবাল নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া, কিছু কৃষক প্রথমে শৈবাল মিশ্রিত খাদ্য দিতে দ্বিধা করেছিলেন, কারণ তারা ভেবেছিলেন এটি পশুর জন্য ক্ষতিকর। পরে প্রশিক্ষণ এবং সফল ফলাফল দেখে তারা আস্থা অর্জন করে। আরেকটি চ্যালেঞ্জ ছিল শৈবালের দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ — শুকনো শৈবাল ৬ মাসের বেশি সংরক্ষণ করা যায় না, যা বড় আকারের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।

অন্যের জন্য শিক্ষা: কীভাবে পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ২০ পয়েন্ট বাস্তবায়ন করবেন

বাংলাদেশের এই পাইলট প্রকল্প থেকে অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলের জন্য বেশ কিছু শিক্ষা রয়েছে। প্রথমত, স্থানীয় প্রেক্ষাপটে শৈবাল চাষের সম্ভাব্যতা যাচাই করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কৃষকদের সম্পৃক্ততা এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো প্রকল্পই সফল হবে না। তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রয়োজন — এই প্রকল্পে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সোশ্যাল ইকোলজি বাংলাদেশের সমন্বয় কাজটি সহজ করেছে। বিশ্বব্যাপী যদি ১০% গবাদি পশুকে শৈবাল-মিশ্রিত খাদ্য দেওয়া হয়, তাহলে বার্ষিক ১.২ গিগাটন CO₂-সমতুল্য নির্গমন কমানো সম্ভব (FAO, ২০২৩)। এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ০.২°C কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

সামুদ্রিক শৈবাল কীভাবে গবাদি পশুর মিথেন কমায়?+

সামুদ্রিক শৈবালে থাকা ব্রোমোফর্ম নামক যৌগ গবাদি পশুর পাচনতন্ত্রে মিথেনোজেনিক আর্কিয়ার এনজাইম ব্লক করে, যা মিথেন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাসপারাগোপসিস ট্যাক্সিফর্মিস প্রজাতি ৮০% পর্যন্ত মিথেন কমাতে পারে (CSIRO, ২০২১)।

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার ২০ পয়েন্টে সামুদ্রিক শৈবালের ভূমিকা কী?+

এই ২০ পয়েন্টের মধ্যে পঞ্চম পয়েন্ট গবাদি পশু থেকে মিথেন কমানোর উপর জোর দেয়, যেখানে সামুদ্রিক শৈবাল একটি প্রাকৃতিক সমাধান। দশম পয়েন্ট কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন নিয়ে কাজ করে, যেখানে শৈবাল চাষের সময় CO₂ শোষিত হয়।

শৈবাল মিশ্রিত খাদ্য কি গবাদি পশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?+

বাংলাদেশের পাইলট প্রকল্পে দেখা গেছে, শৈবাল মিশ্রিত খাদ্য পশুর ওজন বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। Journal of Dairy Science (২০২৩)-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, এটি দুধের গুণমান বা স্বাদে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।

বাংলাদেশে কি বড় আকারে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ সম্ভব?+

হ্যাঁ, বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা শৈবাল চাষের জন্য উপযোগী। বর্তমানে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ছোট আকারের চাষ হচ্ছে, তবে সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে ১০০ একর জমিতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে (বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর, ২০২৪)।

শৈবাল ব্যবহার করে মিথেন কমানোর খরচ কত?+

বর্তমানে প্রতি কেজি শুকনো শৈবাল উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ২০০ টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়), যা প্রতি পশু প্রতি মাসে প্রায় ৩০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ। তবে বড় আকারের চাষ শুরু হলে খরচ ৫০% কমে যেতে পারে (World Bank, ২০২৩)।

Enjoyed this? Save or share.

জলবায়ু
কোল্ড চেইন রেফ্রিজারেন্টস ও জলবায়ু প্রভাবের জন্য একটি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ সুবিধার ভিতরের দৃশ্য
জলবায়ু

পর্যালোচনা: কোল্ড চেইন রেফ্রিজারেন্টস (এইচএফসি) ও জলবায়ু — ব্যস্ত পেশাজীবীদের জন্য ২০২৫ গাইড

খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে এইচএফসি রেফ্রিজারেন্টের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও জলবায়ু প্রভাবের একটি প্রমাণ-ভিত্তিক পর্যালোচনা

4 মিনিট পঠন

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার: বোলিভিয়ার আল্টিপ্লানোতে কুইনোয়া ক্ষেতে কৃষকরা ফসল তুলছেন, পটভূমিতে পাহাড়
জলবায়ু

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার: কুইনোয়ার সরবরাহ চেইন ম্যাপ — বোলিভিয়া থেকে আপনার থালায় ২০২৫

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার বোঝার জন্য কুইনোয়ার উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্বন, শ্রম ও জলবায়ুর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে

4 মিনিট পঠন

পাম অয়েল বাগান ও সিএএফও শিল্প কারখানার তুলনামূলক দৃশ্য—জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও পরিবেশগত ন্যায়বিচার সংকটের প্রতীক
জলবায়ু

পাম অয়েল বনাম সিএএফও সাইটিং: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিবেশগত ন্যায়বিচারের সংকট ২০২৫

ভেগান খাবারে পাম অয়েলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বনাম সিএএফও সাইটিং-এর পরিবেশগত ন্যায়বিচার সংকট—একটি সরাসরি তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

4 মিনিট পঠন

বিশেষ লেখা