Skip to main content
Humane Foundation
▾
জলবায়ু

পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ও খাদ্য ব্যবস্থার এক তদন্ত ২০২৫

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে পনিরের কার্বন ফুটপ্রিন্টের একটি গভীর তদন্ত, সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত, উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্পের তুলনায়।

লিখেছেন অনন্যা চৌধুরী4 মিনিট পঠনঢাকা, বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রতীকী ছবি: একটি শিল্প দুগ্ধ খামারের বায়বীয় দৃশ্য
Humane Foundation / AI-generated

পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। একটি গবেষণা অনুযায়ী, এক কেজি পনির উৎপাদনে গড়ে ২৩.৯ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য (CO2e) নির্গত হয়, যা এক কেজি মুরগির মাংসের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি (Our World in Data, 2024)। এই নির্গমনের অধিকাংশই আসে দুগ্ধ গবাদি পশুর মিথেন উৎপাদন, পশুখাদ্য উৎপাদনে সারের ব্যবহার এবং প্রক্রিয়াকরণে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে।

পনিরের কার্বন ফুটপ্রিন্টের সরবরাহ শৃঙ্খল কীভাবে কাজ করে?

পনিরের সরবরাহ শৃঙ্খল চারটি প্রধান স্তরে বিভক্ত: পশুখাদ্য উৎপাদন, দুগ্ধ খামার, প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবহন। প্রতিটি স্তরে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, পশুখাদ্য উৎপাদন (সার, জমি ব্যবহার) মোট নির্গমনের ৩০% এর জন্য দায়ী, দুগ্ধ খামার (মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড) ৫৫%, প্রক্রিয়াকরণ ১০% এবং পরিবহন ৫% (Journal of Cleaner Production, 2022)।

“পনিরের পরিবেশগত প্রভাব বোঝার জন্য সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করা জরুরি। দুগ্ধ খামার থেকে নির্গত মিথেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”

— ড. সারা আহমেদ, পরিবেশ বিজ্ঞানী, আইসিডিডিআরবি
স্তরনির্গমন ধরনমোট নির্গমনের শতাংশ
পশুখাদ্য উৎপাদনCO2, N2O৩০%
দুগ্ধ খামার (গবাদি পশু)CH4, N2O৫৫%
প্রক্রিয়াকরণCO2১০%
পরিবহন ও বিতরণCO2৫%
পশুখাদ্য ও দুগ্ধ খামার থেকে নির্গমন তুলনা (Source: FAO, 2023)

মিথেন নির্গমন: পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাসের মূল উৎস কেন?

দুগ্ধ গবাদি পশুর পাচনতন্ত্র থেকে নির্গত মিথেন পনিরের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ৫০% এর বেশি। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা ১০০ বছরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ২৮ গুণ বেশি তাপ ধরে রাখে (IPCC, 2021)। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী দুগ্ধ গবাদি পশু থেকে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন টন CO2e নির্গত হয়েছে, যার মধ্যে ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ তিনটি দেশ (FAO, 2024)।

পনির উৎপাদনের শিল্প প্রক্রিয়া ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উৎস
পনির উৎপাদনের শিল্প প্রক্রিয়া ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উৎস— Humane Foundation

বিশ্বের প্রধান অঞ্চলে দুগ্ধ গবাদি পশু থেকে মিথেন নির্গমন (২০২৩)

Source: FAO, 2024

উদ্ভিদ-ভিত্তিক পনিরের সাথে তুলনা: কোনটি কম কার্বন নির্গমন করে?

উদ্ভিদ-ভিত্তিক পনির, যেমন কাজু বাদাম বা সয়া থেকে তৈরি পনির, প্রথাগত পনিরের তুলনায় ৫০-৭০% কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এক কেজি কাজু-ভিত্তিক পনিরের কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৭.২ কেজি CO2e, যেখানে প্রথাগত পনিরের ২৩.৯ কেজি CO2e (The Lancet Planetary Health, 2019)। জমি ব্যবহার ও জলের ব্যবহারেও এই পার্থক্য স্পষ্ট।

খাদ্যকার্বন ফুটপ্রিন্ট (kg CO2e/kg)জমি ব্যবহার (m²/kg)জল ব্যবহার (L/kg)
প্রথাগত পনির২৩.৯৫০৫০০০
কাজু-ভিত্তিক পনির৭.২১৫২৫০০
সয়া-ভিত্তিক পনির৬.১১০২০০০
বাদাম-ভিত্তিক পনির৮.৫২০৩০০০
পনির বনাম উদ্ভিদ-ভিত্তিক পনিরের পরিবেশগত প্রভাব (Source: Our World in Data, 2024)

শিল্পের প্রতিক্রিয়া ও কী পরিবর্তন প্রয়োজন?

দুগ্ধ শিল্পের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে পুনর্জন্মমূলক চারণ ও মিথেন হ্রাসকারী পশুখাদ্য সংযোজন (যেমন সামুদ্রিক শৈবাল) ব্যবহার করে নির্গমন কমানো সম্ভব। তবে, ২০২৪ সালের একটি গবেষণা দেখিয়েছে যে এই পদ্ধতিগুলি মোট নির্গমন মাত্র ১০-১৫% কমাতে পারে (Nature Food, 2024)। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, যেমন পনিরের ব্যবহার কমানো বা উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্পে স্যুইচ করা। নীতি নির্ধারকদের উচিত কার্বন লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা এবং দুগ্ধ শিল্পের জন্য কঠোর নির্গমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা।

“প্রযুক্তিগত সমাধান যথেষ্ট নয়। ভোক্তা সচেতনতা ও নীতি পরিবর্তন ছাড়া পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো সম্ভব নয়।”

— মার্ক স্টিভেনস, জলবায়ু নীতি বিশ্লেষক, ইউএনইপি

সচরাচর জিজ্ঞাসা

পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কতটুকু?+

এক কেজি পনির উৎপাদনে গড়ে ২৩.৯ কেজি CO2e নির্গত হয়, যা মুরগির মাংসের চেয়ে তিনগুণ বেশি। এই নির্গমনের প্রধান উৎস দুগ্ধ গবাদি পশুর মিথেন ও পশুখাদ্যের সার।

উদ্ভিদ-ভিত্তিক পনির কি সত্যিই কম কার্বন নির্গমন করে?+

হ্যাঁ, উদ্ভিদ-ভিত্তিক পনির প্রথাগত পনিরের তুলনায় ৫০-৭০% কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে। কাজু-ভিত্তিক পনিরের কার্বন ফুটপ্রিন্ট প্রায় ৭.২ কেজি CO2e প্রতি কেজি, যা প্রথাগত পনিরের এক-তৃতীয়াংশ।

পনিরের নির্গমন কমাতে কী করা যেতে পারে?+

ভোক্তা পর্যায়ে পনিরের ব্যবহার কমানো বা উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্পে স্যুইচ করা সবচেয়ে কার্যকর। নীতি পর্যায়ে কার্বন লেবেলিং ও দুগ্ধ শিল্পের জন্য নির্গমন লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি।

পনিরের মিথেন নির্গমন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?+

মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা ১০০ বছরে CO2 এর চেয়ে ২৮ গুণ বেশি তাপ ধরে রাখে। পনিরের মোট নির্গমনের ৫০% এর বেশি মিথেন থেকে আসে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে দ্রুত প্রভাব ফেলে।

দুগ্ধ শিল্পের পুনর্জন্মমূলক চারণ কি কার্যকর?+

পুনর্জন্মমূলক চারণ মিথেন নির্গমন ১০-১৫% কমাতে পারে, কিন্তু এটি মোট প্রভাবের তুলনায় সীমিত। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন।

উপসংহার: পনিরের ভবিষ্যৎ ও জলবায়ু দায়িত্ব

পনিরের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে নির্গমন হ্রাসের সুযোগ রয়েছে, তবে সবচেয়ে কার্যকর পথ হল উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্পের দিকে অগ্রসর হওয়া। ভোক্তা, নীতি নির্ধারক ও শিল্পের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া পনিরের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো সম্ভব নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে নির্গমন অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য পূরণে খাদ্য ব্যবস্থার এই পরিবর্তন অপরিহার্য।

Enjoyed this? Save or share.

জলবায়ু
রাতের শিফটের কর্মী পনিরের স্যান্ডউইচ খাচ্ছেন, পাশের স্ক্রিনে পরিবেশ দূষণ ও কার্বন ফুটপ্রিন্টের তথ্য
জলবায়ু

পরিবেশ দূষণ পনিরের কার্বন ফুটপ্রিন্ট: রাতের শিফটের কর্মীদের জন্য ৫টি তথ্য ২০২৫

রাতের শিফট ও অনিয়মিত সময়ের কর্মীদের জন্য পনিরের পরিবেশ দূষণ ও কার্বন ফুটপ্রিন্টের একটি প্রমাণ-ভিত্তিক বিশ্লেষণ।

4 মিনিট পঠন

জলবায়ু পরিবর্তন কি—কিশোর-কিশোরীদের জন্য সিলভোপাসচার ও খাদ্য ব্যবস্থার হাতিয়ার নিয়ে একটি দৃশ্য
জলবায়ু

জলবায়ু পরিবর্তন কি: কিশোর-কিশোরীদের জন্য সিলভোপাসচার ও খাদ্য ব্যবস্থার হাতিয়ার ২০২৫

জলবায়ু পরিবর্তন কি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিশোর-কিশোরীরা কীভাবে সিলভোপাসচার ও উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে কার্বন নির্গমন কমাতে পারে, তা নিয়ে এই টুলকিট।

4 মিনিট পঠন

পরিবেশ দূষণ রচনার প্রেক্ষাপটে মাংসের জমির ব্যবহার: আমাজনে গবাদি পশুর চারণভূমির জন্য বন উজাড়ের বাস্তব চিত্র
জলবায়ু

পরিবেশ দূষণ রচনা: ২০৩০ সালের মধ্যে মাংসের জমির ব্যবহার কীভাবে বদলে দেবে বিশ্ব

পরিবেশ দূষণ রচনার এই ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মাংস উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ২০৩০ সালের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ কমে আসতে পারে, যদি খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়।

4 মিনিট পঠন