পরিবেশ দূষণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের একটি বড় উৎস হলো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল, যার মধ্যে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ অন্যতম। কোপ২৯-এ খাদ্য ও কৃষি বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার লক্ষ্য অসম্ভব হয়ে পড়বে (IPCC, ২০২৩)। এই তদন্ত বাংলাদেশের একটি চাল সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ ও নিয়ন্ত্রক অনুমতি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর উন্মোচন করে।
কী পাওয়া গেল: চাল সরবরাহ শৃঙ্খলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মানচিত্র
আমরা এই তদন্তে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি চাল সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসরণ করি—ধানক্ষেত থেকে শুরু করে ভোক্তার পাতে পৌঁছানো পর্যন্ত। দেখা গেছে, মোট নির্গমনের ৬০% ধানক্ষেত থেকে মিথেন আকারে নির্গত হয়, যা মূলত জমিতে পানি জমিয়ে রাখার কারণে অক্সিজেনের অভাবে তৈরি হয় (IPCC, ২০২২)। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হলো সারের ব্যবহার, যা থেকে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গত হয়—একটি গ্যাস যা কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৩০০ গুণ বেশি শক্তিশালী (Our World in Data, ২০২৪)। তৃতীয় উৎস হলো ধান মিল থেকে তুষ পোড়ানো ও পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার।
“আমরা যদি কেবল ধানক্ষেতের মিথেন নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলে খাদ্য খাত থেকে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন কৃষক পর্যায়ে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সহজলভ্যতা।”
চাল সরবরাহ শৃঙ্খলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের উৎসভিত্তিক বণ্টন
কীভাবে তদন্ত করা হলো: নথি ও অনুমতি পত্রের অনুসন্ধান
আমরা তিনটি স্তরে তথ্য সংগ্রহ করি: প্রথমত, বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে তথ্য অধিকার আইনে সার কারখানা ও ধান মিলের অনুমতি পত্রের জন্য আবেদন করি। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় কৃষক ও মিল মালিকদের সাক্ষাৎকার নিই। তৃতীয়ত, কোপ২৯-এর খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক নথি বিশ্লেষণ করি। দেখা গেছে, ২০২৪ সালে জারি করা ১৫টি সার কারখানার অনুমতি পত্রের মধ্যে মাত্র ৩টিতে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমনের সীমা উল্লেখ ছিল। বাকিগুলোতে শুধু সাধারণ 'পরিবেশগত মান' বজায় রাখার শর্ত ছিল, যা কার্যকর নয়। ধান মিলের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নির্গমন নিয়ম নেই—শুধু বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের সাধারণ আইন প্রযোজ্য (বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ ও পরবর্তী সংশোধনী)।
| নথির ধরন | মোট সংখ্যা | নির্গমন সীমা নির্ধারিত আছে | নির্গমন সীমা নির্ধারিত নেই |
|---|---|---|---|
| সার কারখানার অনুমতি পত্র | ১৫ | ৩ | ১২ |
| ধান মিলের অনুমতি পত্র | ২৫ | ০ | ২৫ |
| পরিবহন লাইসেন্স | ৪০ | ০ | ৪০ |
শিল্পের জবাব: কে কী বলল?
আমরা পাঁচটি সার কারখানা ও দশটি ধান মিলের মালিকের সাথে যোগাযোগ করি। অধিকাংশই জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যারা জবাব দিয়েছেন, তারা বলেছেন, 'নিয়ম মেনে চলতে খরচ বেশি', 'সরকারি সহায়তা নেই', এবং 'আমরা তো ছোট মিল, আমাদের উপর এত কড়াকড়ি কেন?' একটি সার কারখানার ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'আমরা জেনে বুঝে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করি না, কারণ বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।' এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে নিয়ন্ত্রক কাঠামো দুর্বল থাকায় শিল্প পরিবেশ দূষণকে গুরুত্ব দেয় না।
কোপ২৯-এর সিদ্ধান্ত ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
কোপ২৯-এ খাদ্য ও কৃষি বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়: প্রথমত, ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে নির্গমন ২৫% কমানো, এবং দ্বিতীয়ত, টেকসই কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো (UNFCCC, ২০২৪)। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো এই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রস্তুত নয়। সার কারখানার অনুমতি পত্রে নির্গমন সীমা না থাকা, ধান মিলের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকা, এবং পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষতার মান না থাকা—এসবই বড় বাধা। তাছাড়া, কোপ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি (Climate Action Network, ২০২৪)।
কী পরিবর্তন জরুরি: নীতি ও বাস্তবায়নের সুপারিশ
প্রথমত, বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরকে সার কারখানা ও ধান মিলের অনুমতি পত্রে নির্দিষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন সীমা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধানক্ষেতে মিথেন নির্গমন কমানোর জন্য বিকল্প সেচ পদ্ধতি (যেমন মাঝে মাঝে পানি শুকানো) ও উন্নত জাতের ধানের ব্যবহার বাড়াতে হবে (IRRI, ২০২৩)। তৃতীয়ত, ধান মিলে তুষ পোড়ানো নিষিদ্ধ করে বিকল্প জ্বালানি বা কম্পোস্ট তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থত, কোপ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে, স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক ও মিল মালিকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দিতে হবে।
পরিবেশ দূষণ কমাতে করণীয়: একটি ধাপে ধাপে নির্দেশিকা
- 1
নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করুন
সার কারখানা ও ধান মিলের অনুমতি পত্রে নির্দিষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন সীমা যুক্ত করুন এবং তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।
- 2
কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিন
ধানক্ষেতে মিথেন নির্গমন কমানোর জন্য বিকল্প সেচ পদ্ধতি ও জৈব সার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিন।
- 3
তুষ পোড়ানো বন্ধ করুন
ধান মিলে তুষ পোড়ানো নিষিদ্ধ করে বিকল্প জ্বালানি বা কম্পোস্ট তৈরির ব্যবস্থা করুন।
- 4
আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ করুন
কোপ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সবুজ জলবায়ু তহবিল ও অন্যান্য উৎস থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করুন।
- 5
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন
সরকারি ওয়েবসাইটে অনুমতি পত্র ও নির্গমন তথ্য প্রকাশ করুন, যাতে জনগণ ও গবেষকরা তা যাচাই করতে পারেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
পরিবেশ দূষণ কীভাবে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সাথে সম্পর্কিত?+
খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপ—উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। ধানক্ষেত থেকে মিথেন, সার থেকে নাইট্রাস অক্সাইড, ও পরিবহন থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়, যা পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে (FAO, ২০২৩)।
কোপ২৯-এ খাদ্য ও কৃষি বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?+
কোপ২৯-এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২৫% কমাতে হবে এবং টেকসই কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে (UNFCCC, ২০২৪)। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি এখনও পূরণ হয়নি।
বাংলাদেশে চাল উৎপাদনে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর উপায় কী?+
ধানক্ষেতে বিকল্প সেচ পদ্ধতি (যেমন মাঝে মাঝে পানি শুকানো) ব্যবহার করে মিথেন নির্গমন ৫০% কমানো সম্ভব (IRRI, ২০২৩)। এছাড়া উন্নত জাতের ধান, জৈব সার ব্যবহার ও ধান মিলে তুষ পোড়ানো বন্ধ করলে নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা কী?+
সরকারকে সার কারখানা ও ধান মিলের অনুমতি পত্রে নির্দিষ্ট নির্গমন সীমা নির্ধারণ করতে হবে, নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে এবং কৃষক ও মিল মালিকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দিতে হবে। কোপ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ করাও সরকারের দায়িত্ব।










