ভারতের শহরাঞ্চলে শেয়াল-মানুষ সহাবস্থান একটি জটিল বাস্তুসংস্থানিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। দিল্লি ও মুম্বইয়ের মতো মহানগরে শেয়ালের সংখ্যা বাড়লেও, এদের ব্যবস্থাপনায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নেই। আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, বাসস্থান ধ্বংস এবং খাদ্যের অপ্রতুলতাই তাদের শহরে আসার মূল কারণ, যেখানে সাপ্লাই চেইনের পরিবর্তে বন উজাড়ের অনুমোদনই মূল চালিকাশক্তি।
আমাদের তদন্ত শুরু হয় দিল্লির একটি নির্দিষ্ট আবাসন প্রকল্পের অনুমতি পত্রের সন্ধান দিয়ে। আমরা ভারতের বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের ওয়েবসাইট থেকে ২০২৩ সালের একটি প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র (Environmental Clearance) সংগ্রহ করি। এই ছাড়পত্রে ৫০ হেক্টর বনভূমি উজাড়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যেখানে শেয়ালের বাসস্থান ছিল বলে স্থানীয় পরিবেশবিদরা দাবি করেন। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, বন উজাড়ের জন্য কোনো প্রজাতি-নির্দিষ্ট প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি, যা ভারতের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন, ১৯৭২-এর লঙ্ঘন। এরপর আমরা দিল্লি পৌরসভা ও বন বিভাগের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদানের নথি সংগ্রহ করি, যা ২০২৪ সালের তথ্য অধিকার আইনের (RTI) অধীনে পাওয়া যায়। এই চিঠিগুলোতে দেখা যায়, শেয়ালের উপদ্রব নিয়ে পৌরসভা বন বিভাগকে দায়ী করছে, আর বন বিভাগ বলছে এটি পৌরসভার দায়িত্ব। সমস্ত নথি ও রেকর্ড আমরা একটি টেবিলে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করছি।
| নথির ধরন | প্রাপ্তির উৎস | প্রাপ্তির তারিখ | মূল তথ্য |
|---|---|---|---|
| পরিবেশগত ছাড়পত্র | বন ও পরিবেশ মন্ত্রক | জুলাই ২০২৩ | ৫০ হেক্টর বনভূমি উজাড়ের অনুমতি |
| প্রজাতি-নির্দিষ্ট প্রভাব মূল্যায়ন | প্রকল্পের নথি | জুলাই ২০২৩ | অনুপস্থিত |
| পৌরসভা-বন বিভাগের চিঠি | তথ্য অধিকার আইন (RTI) | মার্চ ২০২৪ | দায়িত্ব নিয়ে টানাপোড়েন |
| স্থানীয় পরিবেশবিদের প্রতিবেদন | স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা | ডিসেম্বর ২০২৩ | শেয়ালের বাসস্থান ধ্বংসের প্রমাণ |
আমরা দিল্লির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি আবাসন প্রকল্পের সাইটে গিয়ে দেখি, সেখানে এখনও শেয়াল দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর শেয়ালের সংখ্যা বেড়েছে। প্রকল্পের ঠিকাদারি সংস্থা, গ্রিনফিল্ড রিয়েল্টি, তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলে, 'আমরা সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলেছি এবং শেয়ালের জন্য কোনো সমস্যা সৃষ্টি করিনি।' তবে, তারা বন উজাড়ের আগে কোনো প্রজাতি-নির্দিষ্ট প্রভাব মূল্যায়নের প্রমাণ দিতে পারেনি। দিল্লি পৌরসভার মুখপাত্র বলেন, 'শেয়ালের ব্যবস্থাপনা বন বিভাগের দায়িত্ব, আমাদের নয়।' অন্যদিকে, বন বিভাগের এক আধিকারিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'পৌরসভার আবর্জনা ব্যবস্থাপনার কারণেই শেয়াল শহরে আসে।' এই টানাপোড়েনের কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ভারতের শহরাঞ্চলে শেয়াল-মানুষ সহাবস্থানের জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, বন উজাড়ের আগে প্রজাতি-নির্দিষ্ট প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পৌরসভা ও বন বিভাগের মধ্যে একটি সমন্বিত নীতি তৈরি করতে হবে, যাতে দায়িত্ব স্পষ্ট হয়। তৃতীয়ত, শহরের আবর্জনা ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে শেয়ালের খাদ্যের উৎস কমে। চতুর্থত, শেয়াল তাড়ানোর পরিবর্তে, বাসস্থান পুনরুদ্ধার ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সহাবস্থানের পথ খুঁজতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা শেয়ালকে ভয় না পেয়ে সহাবস্থানের উপায় শিখতে পারে।
আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, ভারতের শহরাঞ্চলে শেয়াল-মানুষ সহাবস্থান একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধান শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং বাস্তুসংস্থানিক ও সামাজিক। বন উজাড়ের অনুমোদন থেকে শুরু করে পৌরসভার আবর্জনা ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ধাপে পরিবর্তন জরুরি। যদি আমরা এখনই পদক্ষেপ না নিই, তাহলে শেয়াল ও মানুষের মধ্যে সংঘাত বাড়বে, যা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হবে।










