দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল টিপসের আড়ালে পর্যটন খামারগুলিতে প্রাণীদের ওপর নিয়মিত নিষ্ঠুরতা চালানো হয়, যা একটি গোপন তদন্তে ধরা পড়েছে। থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই ও ফুকেটের তিনটি জনপ্রিয় খামারে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ধারণকৃত ফুটেজে দেখা গেছে, হাতি ও বাঘকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, খাদ্য ও পানি থেকে বঞ্চিত করা, এবং পর্যটকদের জন্য কৃত্রিম আচরণ শেখানো হচ্ছে। এই ঘটনাগুলি নিয়মিত, ব্যতিক্রম নয়, এবং দেশটির প্রাণী কল্যাণ আইন লঙ্ঘন করলেও অনেক ক্ষেত্রে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।
গোপন তদন্তে কী ধরা পড়ল? ফুটেজের বিস্তারিত বিশ্লেষণ
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে, একটি আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ সংস্থা থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই ও ফুকেটের তিনটি পর্যটন খামারে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করে। ফুটেজে দেখা গেছে, একটি খামারে হাতিদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, তাদের পিঠে পর্যটকদের বসার জন্য ধাতব আসন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা হাতির মেরুদণ্ডের জন্য ক্ষতিকর। আরেকটি খামারে বাঘদের ছোট খাঁচায় রাখা হয়েছে, যেখানে তারা হাঁটতেও পারে না। তৃতীয় খামারে, একটি বাঘের শাবককে দুধের বোতল খাওয়ানোর সময় জোর করে ধরে রাখা হয়েছে, যা স্ট্রেস ও আঘাতের কারণ হয়।
“এই ফুটেজে যা দেখা গেছে তা থাইল্যান্ডের পর্যটন খামারগুলিতে নিয়মিত ঘটনা। হাতি ও বাঘকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়, প্রাণী হিসেবে নয়।”
কেন এই ঘটনাগুলি ব্যতিক্রম নয়? দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন শিল্পের বাস্তবতা
থাইল্যান্ডে আনুমানিক ৩,০০০ পর্যটন খামার রয়েছে, যার মধ্যে ৭০% হাতি ও বাঘ ব্যবহার করে (ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশন, ২০২৩)। এই খামারগুলির অধিকাংশই ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল টিপসের আড়ালে নিজেদের 'নৈতিক অভয়ারণ্য' বলে দাবি করে। কিন্তু বাস্তবে, তারা প্রাণীদের কাছ থেকে অর্থ উপার্জনের জন্য কৃত্রিম আচরণ শেখায়, যেমন হাতিকে পেইন্টিং করা বা বাঘকে মানুষের সাথে ছবি তোলার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রাণীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
| খামারের ধরন | লঙ্ঘনের ধরন | শতাংশ খামার যেখানে লঙ্ঘন দেখা গেছে |
|---|---|---|
| হাতি খামার | শিকল দিয়ে বাঁধা, অতিরিক্ত কাজ, অপর্যাপ্ত খাদ্য | ৮৫% |
| বাঘ খামার | ছোট খাঁচা, জোর করে খাওয়ানো, পর্যটকদের জন্য প্রশিক্ষণ | ৯২% |
| বানর খামার | অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা | ৭৮% |
থাইল্যান্ডের প্রাণী কল্যাণ আইন: কী লঙ্ঘিত হয়েছে এবং কী লঙ্ঘিত হয়নি?
থাইল্যান্ডের প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৪ সালে সংশোধন করা হয়, যা প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিষিদ্ধ করে। আইন অনুযায়ী, প্রাণীদের পর্যাপ্ত খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে তদন্তে দেখা গেছে, এই আইনের অধীনে অনেক লঙ্ঘন প্রমাণিত হলেও সেগুলি শাস্তিযোগ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, হাতিকে শিকল দিয়ে বাঁধা আইনত নিষিদ্ধ নয় যদি তা 'প্রয়োজনীয়' বলে বিবেচিত হয়। বাঘের ছোট খাঁচা আইন লঙ্ঘন করে না, কারণ আইনে খাঁচার ন্যূনতম আকার নির্ধারণ করা নেই।
থাইল্যান্ডে পর্যটন খামারের সংখ্যা ও প্রাণী কল্যাণ লঙ্ঘনের হার (২০২০-২০২৫)
শিল্প ও এনজিও প্রতিক্রিয়া: কারা কী বলছে?
থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ (টিএটি) বলেছে, তারা এই তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করছে এবং 'অভিযোগ প্রমাণিত হলে' ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের পর্যটন খামার সমিতি দাবি করেছে, এই ফুটেজ 'ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে' এবং তারা 'প্রাণী কল্যাণ মান বজায় রাখে'। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলি, যেমন পেটা ও ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশন, থাইল্যান্ড সরকারের কাছে এই খামারগুলি বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় এনজিও 'এলিফ্যান্ট ফ্রেন্ডস ফাউন্ডেশন' বলেছে, 'পর্যটকদের উচিত শুধুমাত্র সার্টিফাইড নৈতিক অভয়ারণ্য বেছে নেওয়া, যেখানে হাতি ও বাঘকে পর্যটনের জন্য ব্যবহার করা হয় না'।
“পর্যটকরা যখন ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল টিপস অনুসরণ করে, তারা প্রায়ই এই খামারগুলিকে সমর্থন করে, কারণ তারা জানে না যে এই খামারগুলি আসলে প্রাণীদের নির্যাতন করে। স্বচ্ছতা ও শিক্ষার প্রয়োজন।”
নীতি প্রভাব: কী পরিবর্তন প্রয়োজন?
এই তদন্তের আলোকে, থাইল্যান্ডের প্রাণী কল্যাণ আইনে বেশ কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রথমত, হাতি ও বাঘের খাঁচার ন্যূনতম আকার নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পর্যটন খামারগুলির জন্য বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং ও নিয়মিত পরিদর্শন চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, 'ইকো-ফ্রেন্ডলি' বা 'নৈতিক' শব্দের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে গ্রিনওয়াশিং বন্ধ হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, পর্যটকদের জন্য একটি গ্লোবাল সার্টিফিকেশন সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে, যা নৈতিক পর্যটন খামার চিহ্নিত করবে (ইউএনডব্লিউটিও, ২০২৪)।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল টিপস কি সত্যিই কাজ করে?+
ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল টিপস কাজ করতে পারে যদি আপনি সেগুলি সঠিকভাবে অনুসরণ করেন। তবে অনেক পর্যটন খামার এই টিপসের অপব্যবহার করে গ্রিনওয়াশিং করে। তাই নির্ভরযোগ্য সার্টিফিকেশন যেমন 'গ্লোবাল সাসটেইনেবল ট্যুরিজম কাউন্সিল' (জিএসটিসি) যাচাই করা জরুরি।
থাইল্যান্ডে হাতি ও বাঘের পর্যটন খামার কি আইনত অনুমোদিত?+
হ্যাঁ, থাইল্যান্ডে হাতি ও বাঘের পর্যটন খামার আইনত অনুমোদিত, তবে প্রাণী কল্যাণ আইন লঙ্ঘন করলে শাস্তি হতে পারে। বাস্তবে, আইনের প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় অধিকাংশ খামার লঙ্ঘন করে চলেছে।
পর্যটন খামারের বিকল্প কী?+
পর্যটন খামারের বিকল্প হিসেবে প্রকৃত নৈতিক অভয়ারণ্য বেছে নিন, যেখানে প্রাণীদের পর্যটনের জন্য ব্যবহার করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, থাইল্যান্ডের 'এলিফ্যান্ট নেচার পার্ক' বা ইন্দোনেশিয়ার 'বোর্নিও অরঙ্গুটান সারভাইভাল ফাউন্ডেশন'।
পর্যটন খামার বয়কট করলে স্থানীয় অর্থনীতির কী হবে?+
পর্যটন খামার বয়কট করলে স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে নৈতিক পর্যটনে রূপান্তর করলে তা টেকসই হবে। স্থানীয় সম্প্রদায়কে নৈতিক পর্যটন উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন ইকো-লজ বা প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প।
কীভাবে নিশ্চিত হব যে একটি পর্যটন খামার সত্যিই নৈতিক?+
নৈতিক পর্যটন খামার চিহ্নিত করতে সার্টিফিকেশন যেমন 'জিএসটিসি' বা 'এএজেডএ' (অ্যাসোসিয়েশন অফ জুস অ্যান্ড অ্যাক্রেডিটেশন) যাচাই করুন। এছাড়াও, খামারের ওয়েবসাইট ও পর্যালোচনা পড়ুন এবং সরাসরি যোগাযোগ করে তাদের প্রাণী কল্যাণ নীতি সম্পর্কে জানুন।
সময়রেখা: তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ১৫ নভেম্বর ২০২৪ | গোপন ক্যামেরা স্থাপন শুরু |
| ২০ নভেম্বর ২০২৪ | প্রথম ফুটেজ সংগ্রহ: হাতিকে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় |
| ২৫ নভেম্বর ২০২৪ | বাঘের খাঁচার ফুটেজ সংগ্রহ |
| ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ | তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত |
| ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ | প্রতিবেদন প্রকাশ ও গণমাধ্যমে প্রচার |
| ২০ জানুয়ারি ২০২৫ | থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া |
| ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ | এনজিওগুলির বয়কট আহ্বান |
এই তদন্ত প্রমাণ করে যে ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল টিপসের আড়ালে পর্যটন খামারগুলিতে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়মিত ঘটনা। পর্যটক, নীতিনির্ধারক ও শিল্পের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।










