ভারতের খাদ্য ব্যবস্থা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী, যেখানে দুগ্ধ খাত ও ধান চাষ একত্রে মোট কৃষি নির্গমনের ৬০% এরও বেশি উৎপন্ন করে (FAO, ২০২৩)। এই তদন্ত ভারতের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তর—ক্ষেত থেকে থালা পর্যন্ত—অনুসরণ করে দেখায় যে কীভাবে নীতি ফাঁকফোকর ও অব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে।
ভারতের খাদ্য ব্যবস্থায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কীভাবে শুরু হয়?
ভারতের খাদ্য ব্যবস্থায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন শুরু হয় প্রাথমিক উৎপাদন স্তরে। ধান চাষে জলাবদ্ধ মাটি থেকে মিথেন (CH₄) নির্গত হয়, যার পরিমাণ বার্ষিক ৪.২ মিলিয়ন টন (ICAR, ২০২২)। অন্যদিকে, গবাদি পশুর পাচন প্রক্রিয়া (এন্টেরিক ফার্মেন্টেশন) থেকে আরও ৯.১ মিলিয়ন টন মিথেন নির্গত হয় (FAO, ২০২৩)। এই দুটি উৎস ভারতের কৃষি নির্গমনের ৭০% এর জন্য দায়ী।
উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলিতে ধান চাষের বিস্তীর্ণ জমি রয়েছে, যেখানে প্রতি হেক্টরে ৫০০-৮০০ কেজি মিথেন নির্গমন হয় (ICAR, ২০২২)। একইভাবে, রাজস্থান ও গুজরাটের দুগ্ধ খামারগুলি প্রতি বছর ২.৫ মিলিয়ন টন মিথেন নির্গমন করে।
“ভারতের খাদ্য ব্যবস্থায় মিথেন নির্গমন কমানো সম্ভব, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ধান চাষের পদ্ধতি পরিবর্তন ও দুগ্ধ খাতে পুষ্টি ব্যবস্থাপনার উন্নতি।”
আমরা কীভাবে নির্গমনের পথ খুঁজে পেলাম?
এই তদন্তে আমরা ভারতের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের তিনটি স্তর অনুসরণ করেছি: উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আমরা সরকারি নথি, FAO ও IPCC রিপোর্ট, এবং রাজ্য-স্তরের কৃষি বিভাগের তথ্য ব্যবহার করেছি। বিশেষ করে, আমরা পাঞ্জাবের ধান চাষ ও গুজরাটের দুগ্ধ খামার থেকে নির্গমন ডেটা সংগ্রহ করেছি।

আমরা দেখেছি যে সারের ব্যবহার থেকে নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) নির্গমন ভারতের কৃষি নির্গমনের ১৫%, যা প্রতি বছর ১.২ মিলিয়ন টন CO₂ সমতুল্য (IPCC, ২০২২)। এই নির্গমন প্রধানত উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে ঘটে, যেখানে ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত ব্যবহার সাধারণ।
| উৎস | নির্গমন (মিলিয়ন টন CO₂ সমতুল্য) | মোট কৃষি নির্গমনের শতাংশ |
|---|---|---|
| গবাদি পশুর মিথেন (এন্টেরিক ফার্মেন্টেশন) | ২৫০ | ৩৫% |
| ধান চাষের মিথেন | ১৮০ | ২৫% |
| সার থেকে নাইট্রাস অক্সাইড | ১০৫ | ১৫% |
| সার ব্যবস্থাপনা থেকে নাইট্রাস অক্সাইড | ৭০ | ১০% |
| খাদ্য বর্জ্য থেকে মিথেন | ৫৫ | ৮% |
| অন্যান্য (জ্বালানি, পরিবহন) | ৫০ | ৭% |
নথি ও রেকর্ড: নির্গমনের প্রমাণ কী বলে?
আমরা তিনটি মূল নথি বিশ্লেষণ করেছি: (১) ভারতের তৃতীয় দ্বিবার্ষিক আপডেট রিপোর্ট (BUR-3, MoEFCC, ২০২৩), (২) FAO-এর গ্লোবাল লাইভস্টক এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট মডেল (GLEAM, ২০২৩), এবং (৩) ICAR-এর ধান চাষ নির্গমন ডেটাবেস (২০২২)। এই নথিগুলি স্পষ্টভাবে দেখায় যে দুগ্ধ খাত ও ধান চাষ ভারতের খাদ্য নির্গমনের মূল চালক।
BUR-3 রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের কৃষি খাত ২০১৯ সালে ৪০৭ মিলিয়ন টন CO₂ সমতুল্য নির্গমন করেছে, যার মধ্যে ২৫০ মিলিয়ন টন এসেছে গবাদি পশু থেকে। FAO-এর GLEAM মডেল আরও দেখায় যে ভারতের দুগ্ধ খাতের নির্গমন তীব্রতা (প্রতি লিটার দুধে) বিশ্ব গড়ের চেয়ে ২০% বেশি।
ভারতে কৃষি নির্গমনের উৎস (২০২২)
শিল্পের প্রতিক্রিয়া: দুগ্ধ ও ধান খাত কী বলছে?
ভারতের দুগ্ধ শিল্পের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে তারা মিথেন নির্গমন কমাতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও উন্নত পশুখাদ্য ব্যবহার শুরু করেছে। ন্যাশনাল ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (NDDB) জানিয়েছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে ১০০টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে (NDDB, ২০২৪)। তবে, সমালোচকরা বলেন যে এই উদ্যোগগুলি পর্যাপ্ত নয়, কারণ খামারের সংখ্যা ৮০ মিলিয়নের বেশি।
ধান চাষের ক্ষেত্রে, ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদ (ICAR) বিকল্প ভেজা-শুকনো (AWD) পদ্ধতি প্রচার করছে, যা মিথেন নির্গমন ৩০-৫০% কমাতে পারে (ICAR, ২০২২)। কিন্তু পাঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরা এই পদ্ধতি গ্রহণে ধীর, কারণ এতে অতিরিক্ত খরচ ও জলের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
কী পরিবর্তন প্রয়োজন?
প্রথমত, ভারতের জাতীয় নির্ধারিত অবদান (NDC) কৃষি খাতের নির্গমনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমানে, ভারতের NDC কৃষি নির্গমনকে পৃথকভাবে লক্ষ্য করে না, যা একটি বড় নীতি ফাঁকফোকর (Climate Action Tracker, ২০২৪)। দ্বিতীয়ত, ধান চাষে AWD পদ্ধতি ও দুগ্ধ খাতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের জন্য ভর্তুকি বাড়ানো প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, খাদ্য বর্জ্য কমাতে সরবরাহ শৃঙ্খলে ঠাণ্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা (কোল্ড চেইন) উন্নত করতে হবে। বর্তমানে, ভারতের ৩০% পচনশীল খাদ্য বর্জ্য হয় (NCCD, ২০২৩)। চতুর্থত, সারের ব্যবহার কমানোর জন্য নির্ভুল কৃষি প্রযুক্তি ও জৈব সার ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কীভাবে খাদ্য ব্যবস্থার নির্গমন কমানো যায়
- 1
ধান চাষে AWD পদ্ধতি গ্রহণ
ধান ক্ষেতে মাঝে মাঝে জল নিষ্কাশন করে মিথেন নির্গমন ৩০-৫০% কমানো যায়। সরকারি ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
- 2
দুগ্ধ খাতে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন
গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করে মিথেন ক্যাপচার করা যায়। প্রতি খামারে ২-৩ লাখ টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন।
- 3
সার ব্যবহারে নির্ভুল কৃষি প্রযুক্তি
GPS ও সেন্সর ব্যবহার করে সারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন কমানো যায়।
- 4
খাদ্য বর্জ্য কমাতে কোল্ড চেইন উন্নতি
ক্ষেত থেকে বাজার পর্যন্ত ঠাণ্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করে বর্জ্য ৫০% কমানো সম্ভব।
- 5
উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ বাড়ানো
দুগ্ধ ও মাংসের পরিবর্তে ডাল, শাকসবজি ও সয়া-ভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করলে নির্গমন ৪০% কমে (The Lancet, ২০১৯)।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
ভারতের খাদ্য ব্যবস্থায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রধান উৎস কী?+
ভারতের খাদ্য ব্যবস্থায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রধান উৎস হলো গবাদি পশুর মিথেন (এন্টেরিক ফার্মেন্টেশন) ও ধান চাষের মিথেন। এই দুটি উৎস একত্রে মোট কৃষি নির্গমনের ৬০% এর বেশি উৎপন্ন করে (FAO, ২০২৩)।
ধান চাষ থেকে মিথেন নির্গমন কীভাবে কমানো যায়?+
ধান চাষে বিকল্প ভেজা-শুকনো (AWD) পদ্ধতি ব্যবহার করে মিথেন নির্গমন ৩০-৫০% কমানো সম্ভব (ICAR, ২০২২)। এই পদ্ধতিতে ধান ক্ষেতে মাঝে মাঝে জল নিষ্কাশন করা হয়, যা মিথেন উৎপাদন কমায়।
ভারতের খাদ্য বর্জ্য থেকে কত গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হয়?+
ভারতে প্রতি বছর ৬৮.৮ মিলিয়ন টন খাদ্য বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৪০% ল্যান্ডফিলে পচে মিথেন নির্গমন করে। এই নির্গমন বার্ষিক ৫৫ মিলিয়ন টন CO₂ সমতুল্য (UNEP, ২০২১)।
ভারতের NDC কি খাদ্য ব্যবস্থার নির্গমন অন্তর্ভুক্ত করে?+
বর্তমানে ভারতের জাতীয় নির্ধারিত অবদান (NDC) কৃষি খাতের নির্গমনকে পৃথকভাবে লক্ষ্য করে না, যা একটি বড় নীতি ফাঁকফোকর (Climate Action Tracker, ২০২৪)। বিশেষজ্ঞরা এটিকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে পারে?+
দুগ্ধ ও মাংসের পরিবর্তে ডাল, শাকসবজি ও সয়া-ভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৪০% পর্যন্ত কমতে পারে (The Lancet, ২০১৯)। এটি খাদ্য ব্যবস্থার নির্গমন কমাতে একটি কার্যকর উপায়।






