জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নীতি-নির্ধারণী বিষয়। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক তহবিলের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশের কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে এই অর্থায়নের বণ্টনে বৈষম্য, জটিল আবেদন প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। এই নিবন্ধে জলবায়ু অর্থায়নের আইনি কাঠামো, কারা এর আওতায় আসে, কারা বাদ পড়ে, প্রয়োগের রেকর্ড ও সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
জলবায়ু অর্থায়নের আইনি কাঠামো কীভাবে কাজ করে?
জলবায়ু অর্থায়নের মূল আইনি ভিত্তি হলো ১৯৯২ সালের জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) ও ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি। এই চুক্তিগুলো উন্নত দেশগুলিকে উন্নয়নশীল দেশে জলবায়ু কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা দেয়। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি প্যারিস চুক্তির আওতায় প্রধান অর্থায়ন ব্যবস্থা। GCF-এর লক্ষ্য হলো প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা, তবে বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ হয়নি (OECD, ২০২৪)।
আবেদন প্রক্রিয়ায় সাধারণত দেশীয় সরকার বা আঞ্চলিক সংস্থাগুলো প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়, যা GCF-এর বোর্ড অনুমোদন করে। তবে ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সক্ষমতা ও তথ্য-প্রযুক্তি সুবিধা নেই। ফলে অধিকাংশ তহবিল বড় আকারের সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে ব্যয় হয়, যা ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে পৌঁছায় না (IIED, ২০২৩)।
“জলবায়ু অর্থায়নের বর্তমান কাঠামো ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কার্যকর নয়। তাদের প্রয়োজন সরলীকৃত প্রক্রিয়া ও স্থানীয় অংশীদারিত্ব।”
কে জলবায়ু অর্থায়নের আওতায় আসে এবং কে বাদ পড়ে?
জলবায়ু অর্থায়নের আওতায় সাধারণত সরকারি সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO) ও বড় কৃষি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আসে। তবে ক্ষুদ্র কৃষক, বিশেষত নারী কৃষক ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রায়ই বাদ পড়ে। কারণ তাদের জমির মালিকানা নথি নেই, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই বা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই (FAO, ২০২৩)।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে জিএফসি-অর্থায়িত একটি প্রকল্পে শুধুমাত্র বড় কৃষি সমবায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যেখানে ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রবেশাধিকার ছিল না (দি ডেইলি স্টার, ২০২৪)। অন্যদিকে, নাইজেরিয়ায় একটি জলবায়ু অর্থায়ন প্রকল্পে নারী কৃষকদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ১২% (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ২০২৩)।
| গ্রুপ | আওতাভুক্ত | বর্জিত |
|---|---|---|
| বড় কৃষি ব্যবসা | হ্যাঁ | না |
| সরকারি সংস্থা | হ্যাঁ | না |
| ক্ষুদ্র কৃষক | আংশিক | হ্যাঁ |
| নারী কৃষক | কদাচিৎ | হ্যাঁ |
| আদিবাসী সম্প্রদায় | না | হ্যাঁ |
জলবায়ু অর্থায়নের প্রয়োগ রেকর্ড কেমন?
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের প্রয়োগ রেকর্ড মিশ্র। ২০২৪ সাল পর্যন্ত GCF মোট ২২২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার মূল্য প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার (GCF, ২০২৪)। তবে এই প্রকল্পগুলোর মাত্র ২০% সরাসরি ক্ষুদ্র কৃষকদের উপকারে এসেছে বলে একটি স্বাধীন মূল্যায়নে দেখা গেছে (ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, ২০২৩)।
বাংলাদেশে GCF-অর্থায়িত 'ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ফার্মিং' প্রকল্পটি ৫০,০০০ কৃষকের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে পৌঁছেছে মাত্র ১৮,০০০-এ (বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ২০২৪)। ভারতের ক্ষেত্রে, একটি GCF প্রকল্পে ব্যয়িত অর্থের ৪০% প্রশাসনিক খরচে চলে গেছে, যা কৃষকদের কাছে পৌঁছায়নি (সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, ২০২৩)।
GCF-অর্থায়িত প্রকল্পে ক্ষুদ্র কৃষকদের অংশগ্রহণের হার
জলবায়ু অর্থায়নের আইনি ফাঁকফোকর কী কী?
জলবায়ু অর্থায়নের আইনি কাঠামোতে বেশ কিছু ফাঁক রয়েছে। প্রথমত, প্যারিস চুক্তির ৯ নং অনুচ্ছেদে উন্নত দেশগুলির অর্থায়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা বাস্তবায়নে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। দ্বিতীয়ত, GCF-এর আবেদন প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কোনো বিশেষ বিধান নেই। তৃতীয়ত, তহবিল বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, যার ফলে দুর্নীতি ও অপচয়ের সুযোগ তৈরি হয় (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, ২০২৩)।
উদাহরণস্বরূপ, কেনিয়ায় একটি GCF প্রকল্পে ৫ মিলিয়ন ডলার অপচয় হয়েছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে (দি গার্ডিয়ান, ২০২৪)। এই ফাঁকগুলো দূর করতে আইনগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সংস্কার প্রস্তাব: কীভাবে জলবায়ু অর্থায়ন আরও কার্যকর করা যায়?
জলবায়ু অর্থায়নকে আরও কার্যকর করতে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। প্রথমত, GCF-এর আবেদন প্রক্রিয়া সরলীকরণ করতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র কৃষকরা সরাসরি আবেদন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করতে হবে, যেমন কৃষক সমিতি ও স্থানীয় NGO-কে তহবিল বণ্টনের দায়িত্ব দেওয়া। তৃতীয়ত, স্বচ্ছতা বাড়াতে তহবিল বণ্টনের তথ্য প্রকাশ করতে হবে (ওয়ান, ২০২৪)।
চতুর্থত, আইনি কাঠামোতে ক্ষুদ্র কৃষকদের 'ভালনারেবল গ্রুপ' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের জন্য বিশেষ কোটা নির্ধারণ করতে হবে। পঞ্চমত, নারী কৃষকদের জন্য লিঙ্গ-সংবেদনশীল অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রয়োজন (UN Women, ২০২৩)।
জলবায়ু অর্থায়নের আবেদন প্রক্রিয়া সরলীকরণের পদক্ষেপ
- 1
প্রথম ধাপ: অনলাইন পোর্টাল সহজ করা
GCF-এর অনলাইন আবেদন পোর্টালটি বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করুন এবং প্রয়োজনীয় নথির সংখ্যা কমিয়ে দিন।
- 2
দ্বিতীয় ধাপ: স্থানীয় প্রশিক্ষণ
ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করুন, যেখানে তারা আবেদন প্রক্রিয়া বুঝতে পারে।
- 3
তৃতীয় ধাপ: অংশীদারিত্ব গঠন
স্থানীয় কৃষক সমিতি ও NGO-কে তহবিল বণ্টনের দায়িত্ব দিন, যাতে তারা ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
- 4
চতুর্থ ধাপ: স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
তহবিল বণ্টনের তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করুন এবং নিয়মিত অডিট পরিচালনা করুন।
- 5
পঞ্চম ধাপ: নারী কৃষকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা
নারী কৃষকদের জন্য আলাদা কোটা ও সহায়তা ব্যবস্থা চালু করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
জলবায়ু অর্থায়ন কীভাবে ক্ষুদ্র কৃষকদের সাহায্য করে?+
জলবায়ু অর্থায়ন ক্ষুদ্র কৃষকদের খরা-সহনশীল বীজ, সেচ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ সরবরাহ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করে। তবে বর্তমানে এই অর্থায়নের অধিকাংশ বড় প্রকল্পে ব্যয় হয়, ফলে ক্ষুদ্র কৃষকরা সীমিত সুবিধা পায়।
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড কী?+
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) হলো জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক তহবিল, যা উন্নয়নশীল দেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়ন করে। এটি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্যারিস চুক্তির আওতায় কাজ করে।
জলবায়ু অর্থায়নে কারা বাদ পড়ে?+
জলবায়ু অর্থায়নে প্রায়ই ক্ষুদ্র কৃষক, নারী কৃষক ও আদিবাসী সম্প্রদায় বাদ পড়ে। কারণ তাদের জমির মালিকানা নথি নেই, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই বা জটিল আবেদন প্রক্রিয়া পূরণের সক্ষমতা নেই। FAO-এর ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এই বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছে।
জলবায়ু অর্থায়নের আইনি ফাঁকফোকর কী?+
জলবায়ু অর্থায়নের আইনি ফাঁকফোকরের মধ্যে রয়েছে প্যারিস চুক্তির অর্থায়ন বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নে আইনি বাধ্যবাধকতার অভাব, GCF-এর আবেদন প্রক্রিয়ায় ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিশেষ বিধানের অভাব ও তহবিল বণ্টনে স্বচ্ছতার অভাব। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
জলবায়ু অর্থায়নের সংস্কার কীভাবে সম্ভব?+
জলবায়ু অর্থায়নের সংস্কারের জন্য GCF-এর আবেদন প্রক্রিয়া সরলীকরণ, স্থানীয় অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিশেষ কোটা নির্ধারণ প্রয়োজন। ওয়ান-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে এই সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।






